একটি বিষণ্ণ রাইফেল : রায়হান রাইন
প্রিন্ট / প্রকাশনী: প্রথমা
- Estimated Delivery : Up to 4 business days
- Free Shipping & Returns : On all orders over $200
দীর্ঘ সময় ধরে চলা স্বৈরাচারী শাসনামলে গুম-খুন-বিচারহীনতার শত-সহস্র গল্পের প্রতিচ্ছবি শাফায়েতের জীবন। দর্শনের প্রতি কথাসাহিত্যিক রায়হান রাইনের উতলা প্রেমের কারণেই হয়ত কেন্দ্রীয় চরিত্র শাফায়েত অন্যান্য চরিত্র এবং নিজেরই কল্পিত সত্তার সাথে অনবরত দর্শনের জটিল বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করতে থাকে পাঠকের বোধগম্য ভাষায়, নিজের মধ্যেই নিজেকে প্রতিনিয়ত খুঁজে ফেরে সে। ভাষা কি একটা অস্ত্র নয় কিংবা সত্য কি আসলে সময়ের প্রয়োজনে গ্রে হয়ে ওঠার অধিকার রাখে?- এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তরে যুক্তি আর পাল্টা যুক্তি চলতে থাকে উপন্যাসজুড়ে। এমনকি একাধিক জরথ্রুস্ত্রেরও দেখা মিলে!
গুমদশা থেকে ভাগ্যের জোরে মুক্তি পাওয়া শাফায়েত বিশ্বাস করে তার একজন গার্ডিয়ান এঞ্জেল আছে এবং ডাকলে সে সাড়া দেয়। এক মুক্তিযোদ্ধা তার সেই গার্ডিয়ান এঞ্জেল, যাকে বিজয়ের মাত্র তিন দিন আগে আলবদর বাহিনী চোখ উপড়ে খুন করে শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমিতে ফেলে না রাখলে তিনি হয়ত শাফায়েতের পিতা হতে পারতেন কিংবা হয়ত এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি না ঘটলে জন্মই হত না শাফায়েতের, যেমন মুক্তিরা অকাতরে প্রাণ বিলাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ না হলে হয়ত জন্মই হত না বাংলাদেশেরও। দৃশ্যত শাফায়েতের মুক্তি মিললেও কার্যত তা মিলে না। আর শাফায়েতের কলম, যা সরকারের কথিত সাফল্যকে ম্লান করে চলে বার বার, শতবার নির্যাতনেও তা থামে না! তাই থামে না ফ্রেঞ্চ কাট, ক্লিন শেভড আর ডেপুটিও। তাদের নজরদারিতে ত্যক্ত-বিরক্ত শাফায়েত একসময় ছদ্মবেশ নিয়ে হয়ে ওঠে মুনশি ইব্রাহিম। কিন্তু তাতেও মুক্তি মিলে কি? আইনের শিকলে যাদের বাঁধা যায় না, তাদের জন্যই নিশ্চয়ই ফ্রেঞ্চ কাট, ক্লিন শেভড আর ডেপুটি। আর এদের ডান হাত, বাম হাত হয়ে ওঠে অপরাধী চক্র, বিনিময়ে পায় দায়মুক্তি।
চিত্রশিল্পী তনুজা শারমিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নুসরাত, সন্তান রূপা, স্ত্রী নাজনীন- কাকে কতটা ভালোবাসে শাফায়েত? কাকে কার চেয়ে বেশি? এইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজনই পড়েনি। কেননা নিজের অন্তর্গত সত্তাকে খুঁজে ফেরা শাফায়েত আর অন্যায়ের প্রতিবাদে একের পর এক শব্দ লিখে যাওয়া কলমের ক্রিয়া আর তার প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতেই কেবল তাদের বিচরণ। গুম কিংবা খুন আবার কখন যে তাকে শিকারে পরিণত করে, সেই ভয়ে নিজের সন্তানকে একটা বার জড়িয়ে ধরতে না পারার বেদনা সময়ে সময়ে ছাপিয়ে গেছে সব। শাফায়েতের ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা তনুজার ক্যানভাসে উচ্চতর হৃদয়বৃত্তির বাই প্রোডাক্টের প্রতিবিম্ব মুনশি ইব্রাহিমকে বিহ্বল করে তোলে ঠিকই! আরো আছে চাঁদে পীরের মুখ, মোস্তফার বোমা বানানো, ভাস্কর্য সব ভেঙে ফেলার মিছিল, আর সেই মিছিলে মুনশি ইব্রাহিম! মিছিলে একই রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন, যা শাফায়েতের কলম থামাতেও উদ্ধত!
ট্রিগার হ্যাপি ইকোনমিকস, রুহানিয়াত, আজাদি কিংবা হাতে তোলা নেওয়া মাত্রই অস্ত্রের বেঁচে ওঠা, জার্মান শেফার্ড, আর তার প্রভু কালামও আছে ‘একটি বিষণ্ন রাইফেলে। শাফায়েতের বাড়ির কাজের সহযোগী কালাম আর ক্র্যাব স্বৈরাচার পতনের মিছিলে শামিল! মিছিলের সাফল্য এলেও ক্র্যাব আর কালাম ফিরে আসে না। শেষ মুহূর্তে আস্থাহীন শাফায়েত কিংবা মুনশি ইব্রাহিমও ধরা পড়ে। রক্তমাখা শাফায়েত ফিরে কি আর? জাদু বাস্তবতার ক্যানভাসে শাফায়েত, কালাম, ক্র্যাবসহ সহস্র রক্তমাখা ছাত্র-জনতা হেঁটে চলে ঠিকই; হাসপাতালের বারান্দা থেকে মর্গ, গোরস্থান থেকে চায়ের দোকান- সর্বত্র! এত রক্তের বিনিময়ে পথ কি তবু কন্টকমুক্ত হয়? ভ্যানচালকের চালের দাম কি কমলো? মজুরের বাচ্চাগুলা কি এর বেশি কিছু চেয়েছিলো? কমেনি যে, তার মানে কি আবারও মরতে হবে? জরথুস্ত্র কি বলে উঠলেন, “ট্রায়াল এন্ড এরর, ট্রায়াল এন্ড এরর, ট্রায়াল এন্ড এরর…?” তবু পালানো স্বৈরাচার মরেও কি শান্তি পাবে? স্লোগানের কম্পনে, কলমের খোঁচায়, ক্র্যাবের হুঙ্কারে, কৃতকর্মের শাস্তির দাবড়ানিতে সে কি মরেও প্রাণ ভয়ে দৌড়াবে না?
একটি রাইফেল বিষণ্ণ হয়ে উঠলে সে কি আর গুলি করতে জানে? এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি মিলবে না এই উপন্যাসে। কিন্তু একাত্তরের একটা রাইফেল কোনো গুলি না ছুঁড়েও কী করে বহু বছর পরের এক গণঅভ্যুত্থানে কাজে লাগতে পারে, সেই গল্পের মনোমুগ্ধকর ছবিই কি রায়হান রাইন এঁকেছেন এই উপন্যাসে? রাইফেলটি পাঁচ দশকেরও বেশি পুরনো। অথচ একাত্তরের বহু পর জন্মানো শাফায়েত যখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক গুমের শিকার হয়ে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে; তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা, যাকে সে কখনো দেখেনি, তাঁর সঙ্গ আর অকুতোভয় মনোবল শাফায়েতকে যন্ত্রণা সইবার শক্তি জোগায় ঠিকই। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও বাকস্বাধীনতাহীনতা, গুম, খুনের উর্বর জমিনে আপোষহীন লড়ে যাওয়ার রূপকময় গল্প ‘একটি বিষণ্ন রাইফেল।’ পারিজাত, কৃষ্ণচুড়া আর গগনশিরীষের গল্প ‘একটি বিষণ্ন রাইফেল।’











